তৃতীয় লিঙ্গের অন্তর্দহন: সমাজচ্যুতি, মনস্তত্ত্ব ও সাহিত্যে প্রতিফলন
收藏资源简介:
সারসংক্ষেপ: সমাজের দিগন্ত বিস্তৃত প্রান্তরে যুগ যুগ ধরে এক অদ্ভুত কৌতূহলের উৎস হয়ে আছে এমন এক মানবগোষ্ঠী, যারা না নারীত্বের ছায়ায়, না পুরুষত্বের দৃপ্ততায় নিজেদের সম্পূর্ণ করে তুলতে পেরেছে। এদের অস্তিত্ব যেন সামাজিক স্বীকৃতির প্রান্তসীমায় অবাঞ্ছিত এক উপস্থিতি। সমাজ যাদের গ্রহণ করে না আপন পরম্পরায়, তাদের আমরা চিহ্নিত করি ‘হিজড়ে’ নামে—আজকের ভাষায় যাঁরা ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ বা ‘তৃতীয় সত্তা’ বলে অভিহিত। এই তৃতীয় সত্তার জীবনভাস্কর্য চিত্রিত হয়েছে আমাদের সাহিত্যের উজ্জ্বল প্রাঙ্গণেও। মনীষী সাহিত্যিকগণ তাঁদের অনুপম কলমের স্পর্শে ফুটিয়ে তুলেছেন এই অবহেলিত মানবসমষ্টির অন্তর্লীন যন্ত্রণা ও ছিন্ন জীবনধারার বিচিত্র রূপ। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নসুবালা’, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নসুমামা’, কবিতা সিংহের ‘সখী সোনা’, আবুল বাশারের ‘মরমী’, ‘মালিয়া’ মানব চক্রবর্তীর ‘মুরলী’ ‘জেনা’, ‘কানহাইয়া’, ‘কামু’, ‘বিন্তি’, এবং স্বপ্নময় চক্রবর্তীর ‘আইভি’, ডি. কে. মাহাতোর সৃষ্ট চরিত্রসমূহ এই সমাজচ্যুত তৃতীয় লিঙ্গের আত্মার অন্তরঙ্গ প্রতিচ্ছবি রূপে উদ্ভাসিত হয়েছে। এঁরা প্রত্যেকেই নিজের নিজের বেদনাগাথা বয়ে বেড়িয়েছেন এক অন্তর্লীন অন্ধকারের অতলে। প্রথমত, এদের সবচেয়ে মৌলিক সংকট হলো— ‘পরিচয়হীন পরিচয়’। এ এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব; জন্মসূত্রে মানবজাতির অংশ হলেও, সামাজিক রীতি-নীতির শৃঙ্খলে এঁরা চিরকাল অনাহূত। মনস্তত্ত্বের দিক থেকে বলতে গেলে, এই বিচ্ছিন্নতা এদের চেতনাকে বিকারগ্রস্ত করে তোলে; স্বাভাবিক জীবনধারার ছন্দপতন ঘটে। সমাজ এদের দেহের বাস্তবতা মেনে নিতে পারেনি, তাই মননের স্বাভাবিক বিকাশে বারংবার বাধা আসে। যৌন পরিচয়ের স্বাভাবিক গতিধারায় অন্তর্ভুক্ত হতে না পারার যন্ত্রণা এদের মানসিক অস্তিত্বকে চিরন্তন এক দহনের মধ্যে নিক্ষিপ্ত করে। পরিবার নামক আশ্রয়কেন্দ্রও এদের জন্য রচিত হয় না। সংসারের মধুর কোলাহলে এদের স্থান বরাদ্দ হয় না; সমাজ এদের করে তোলে প্রান্তিক, গৌণ এবং কখনো কখনো ঘৃণিত। সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানের মঞ্চেও এদের ভূমিকা নির্ধারিত থাকে বৈষম্যের কণ্টকময় রেখায়। সদ্যোজাত শিশুর আগমনে কেবল ঢাক বাজানো, নাচ-গানের মাধ্যমে অলক্ষুণে প্রথা পালনে এদের আহ্বান করা হয়, সম্মানিত অতিথির আসনে বসার নিমন্ত্রণ নয়। এই বৈষম্যমূলক আচরণ যে কতখানি নিষ্ঠুর, তা গভীরভাবে অনুধাবন করলে বোঝা যায়—যাদের নিজ গর্ভে একটিও সন্তান জন্মদানের সৌভাগ্য নেই, তাদেরই আবার অন্যের সন্তানের আগমনে আনন্দ-উল্লাসের আয়োজন করতে বাধ্য করা হয়। এই বৈপরীত্য, এই অন্তর্লীন আঘাত, এদের জীবনকে করে তোলে এক বেদনার্থ মনস্তাত্ত্বিক সংকটের স্থায়ী আবাসভূমি। অ্যালেন গিন্সবার্গ যেমন লিখেছিলেন — “I saw the best minds of my generation destroyed by madness…” তৃতীয় সত্তার জীবনও যেন এমন এক নৈরাশ্যের গীত, যা ধ্বংসের অশ্রুময় প্রবাহে গড়িয়ে পড়ে। তৃতীয় লিঙ্গের এই অন্তরঙ্গ বেদনা সাহিত্যের আঙিনায় উঠে আসা মাত্রই আমাদের সামনে উন্মোচিত হয় সমাজের অন্ধকার দিকচিত্র। এই চরিত্রসমূহ শুধু তাদের ব্যক্তিগত জীবনের নয়, বরং সমগ্র সমাজব্যবস্থার অমানবিকতা ও সংকীর্ণতার দলিল। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সাহিত্যেও তৃতীয় লিঙ্গের বেদনা ও বিচ্ছিন্নতা বারবার ফুটে উঠেছে। শেকসপিয়ারের নাটকে ‘Twelfth Night’ বা ভার্জিনিয়া উলফের ‘Orlando’ উপন্যাসে আমরা দেখি লিঙ্গ পরিবর্তনের দ্বন্দ্ব ও সত্তাগত সংকটের অসামান্য চিত্রায়ণ। ভারতীয় দার্শনিক অরবিন্দ ঘোষের মতে, “সত্যদর্শন হচ্ছে আত্মার মুক্তি।“ — অথচ এই তৃতীয় লিঙ্গের মানুষেরা জন্ম থেকেই মুক্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত। সমাজের কঠিন ..



